লিখা:হাবিবুর রহমান
https://www.linkedin.com/in/habibur-rahman-15b21b125/
"আমাদের যে জ্ঞান সম্ভার কতটা নগণ্য মানের ছিল, তা ইন্টারনেট আমাদের হাতের নাগালে পুরোপুরি না আসা পর্যন্ত আমরা বোধ হয় জানতেই পারতাম না। অবশ্যই আমাদের পূর্ব পুরুষদের জ্ঞানার্জনের এতগুলো সহজ পদ্ধতির ব্যবস্থাই তাদের ছিলনা। প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন ফ্যাসিলিটি এবং গ্যাজেট গুলো আরো বেশি সহজলভ্য হওয়ার পর আমরা আরো বেশি করে বুঝতে পারলাম যে, আমাদের জ্ঞান সম্ভার কতটা নগণ্য মানের ছিল। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ার সাফল্য আমাদের মোবাইল ফোনের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁকিয়ে থাকার কিংবা সময় ব্যয় করা শিখতে বাধ্য করল। গুগল, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউব কিংবা ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের কিন্তু একটা বিশাল উপকার হয়েছে অটোমেটিক ভাবেই, তা হল সারা বিশ্বের সকল ধরণের নামকরা কর্মপদ্ধতি, প্র্যাকটিস, কালচার, গবেষণা, জ্ঞানের ভান্ডার, রিসার্চ পেপার ইত্যাদি সকল কিছু হাতের নাগালে এসে পড়েছে। কে, কোথায় কি নিয়ে গবেষণা করছেন, নতুন কিছু উদ্ভাবন করছেন কিংবা নতুন কিছু ভাবছেন, তা তিনি যে কোন ভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোর জন্য ডলার খরচ করে বুস্টিং পর্যন্ত করছেন। মূলত তিনি টাকা খরচ করে আমাদের কিন্তু এক প্রকার ফ্রী উপকার করেই যাচ্ছেন।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি গুলো তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধির স্বার্থেই, তাদের একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে আপনার ইন্টারেস্ট কে প্রাধান্য দিয়ে আপনার কাঙ্খিত সকল সার্চ কে ইন্টারনেট, ফেসবুকে, গুগল, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রামে অনবরত প্রদর্শন করছে। আমি এই ধরণের প্রতিটা ব্যাপারকে পজিটিভ হিসেবে মেনে নেয়ার চেষ্টা করি। আমার কাছে এগুলোকে সোশ্যাল মিডিয়ার আশীর্বাদ বলেই মনে হয়। তাই লক্ষ্য করুন যে, এখন আপনি চাইলেই যে কোন বই পড়তে পারবেন, যে কোন বিষয় নিয়ে লক্ষ আর্টিকেল অনুসন্ধান করে আপনার মন মত পড়াশুনা করে ফেলতে পারবেন, হাজার মানুষের মতামত গ্রহণ করতে পারবেন পুরোপুরি ফ্রীতেই।
ধরুন এখন আমার জন্য লীন সিক্স সিগমার ১০০ টুল নিয়ে পড়াশুনা করা, ইউটিউব ভিডিও দেখা, শত প্রকার আর্টিকেল সংগ্রহ করা শুধু মাত্র ইচ্ছা শক্তির উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিষয়টাই ২০০০ সালে অসম্ভবের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। আমি এখন ইচ্ছা করলেই জাপানীজ কর্মপদ্ধতির যে কোন পাঠ অনায়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াশুনা করতে পারছি। সবচেয়ে মজাদার বিষয় হল, পুরো ব্যাপারটাই ঘটানো সম্ভব হচ্ছে একদম ফ্রীতে।
এই রকম ভাবে আমরা সকলেই অনুসন্ধান করি না করি, কিংবা পড়াশুনা ও নাই বা করলাম, কিন্তু আমরা নিশ্চয় টার্ম গুলো কিংবা নাম গুলো কিন্তু ইতোমধ্যেই জেনে ফেলেছি। এমন একটা বহুল উচ্চারিত শব্দ হল "কাইজেন।" তবে আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, আমরা কতিপয় মানুষ শুধু শব্দটাই জানি অথবা সংজ্ঞা টুকুই ইন্টারনেটে পড়েছি, অথবা আমাদের কর্মস্থলে অনেকবার শুনেছি। তাই এই বিষয় নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনার একটা সুযোগ গ্রহণ করতে চাইছি। "কাইজেন" এর মত দারুন এবং ব্যাপক বিষয় নিয়ে যে একটা সেমিস্টার সমতুল্য পড়াশুনা করা যেতে পারে, এইটা কিন্তু আমিই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করেই শিখেছি। এতবড় এই বিষয়ে আমরা অনেকেই কেন যেন খুব কম জানি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থাতে ও এই ধরণের বিষয় গুলো বা বিশ্বের দরবারে পরীক্ষিত পদ্ধতি গুলো পাঠ্যক্রমে আনয়নের কোন সুযোগ পর্যন্ত আছে কি না আমার জানা নাই। আমার কাছে মনে হয় এই বিষয় গুলো যদি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পরীক্ষার মার্ক্স্ তোলার জন্য ও বাধ্য হয়ে পড়তাম তাহলে ও অনেক বেশি কর্মমুখী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতাম। কর্মজীবনে প্রবেশ করেই অনেক কিছু হয়ত কাজ লাগানোও যেত।
আজকের আমাদের আলোচনা "কাইজেন" নিয়ে।
বড়রা বলেন, এখন বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই নাকি মাত্রাতিরিক্ত অলস। এবং তারা নিজেদের কাজটুকু বাদ দিয়ে কোনকিছুই করতে চান না। এক জায়গায় বসে বসে কাজ হোক কিংবা মোবাইল ঘাটা, নড়াচড়ায় বেজায় নারাজ। তবে জাপানের এই পদ্ধতি আপনাকে নতুন করে মেলে ধরার সুযোগ করে দেবে! কেমন করে?
যেকোনও কাজের আগে প্রত্যেকের উচ্ছাস – মতামত এবং অনুপ্রেরণা প্রয়োজন, তবেই সেই কাজ খুব ভালভাবে সম্পন্ন হয়। আর মন মানসিক ঠিক না থাকলে আপনারই মুশকিল। সুতরাং যেটি করতে হবে সেই পদ্ধতির নাম হল কাইজেন ( Kaizen ) – এটি এমন একটি বিষয় যার মাধ্যমেই আপনি শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সচল অনুভব করবেন।
কাইজেন আসলে ঠিক কী?
এটিকে চিকিৎসার ভাষায় ওয়ান মিনিট প্রিন্সিপল বলা হয়। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে, অথবা নিজেকে মোটিভেট করতে এটি আপনার কাজে আসতে পারে। এতে অলসতা কমে গিয়েই, কাজ করার ইচ্ছে বাড়তে থাকে। জাপানিজ ভাষায়, কাই শব্দের অর্থ চেঞ্জ অথবা পরিবর্তন এবং জেন অর্থাৎ উইজডম বা ইচ্ছে। মাসাকি ইমাই নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম এই থেরাপির আবিষ্কার করেন। ইমাই মনে করেন, এমন একদিনও পার হয় না যেখানে আপনি নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ না করে চলে আসেন সেই ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে হবে। কাইজেন একদিন দুদিন নয়, প্রতিদিন অভ্যাস করতে হবে তবেই লাভ।
এটি কীভাবে কাজ করে?
কাইজেন এমন একটি থেরাপি যেটি সারাদিনে আপনার থেকে এক মিনিট চেয়ে নেয়। অর্থাৎ আপনি হঠাৎ করেই যদি কোনও বই পড়ছেন অথবা পডকাস্ট শুনছেন, সেই এক মিনিট আপনাকে নির্দিষ্ট কাজেই ব্যয় করতে হবে। হেডফোনে অডিও বুক শুনছেন কিন্তু হাতে আবার ফেসবুক স্ক্রল করছেন তাহলে কিন্তু কোনটাই হলনা। সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে – এবং প্রতিদিন একই সময় এই কাজটি করা বাধ্যতামূলক। যতই অলসতা অনুভূত হতে থাকুক, কাজ শেষ না করে ওঠা চলবে না।
কিছু কিছু বিষয় অবশ্যই এই সময় মনে রাখা দরকার:

প্রথমেই তাড়াহুড়ো করা যাবে না

প্রতিদিন সমান সময় ব্যয় করতেই হবে।

যখন একটু অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, তখন সময় চাইলে বাড়াতেও পারেন।

সারা জীবনের যেকোনও সময়ে এটিকে অভ্যাস করা যায়, নির্দিষ্ট কোনও বয়স নেই – শুধু মনে রাখবেন নিজের উদ্দেশ্যে টিকে থাকতে হবে।
কাইজেন একটি জাপানি শব্দ যার অর্থ অদম্য অব্যাহত নিরবচ্ছিন্ন পথচলা, অব্যাহত উন্নয়ন সুনিশ্চিতকরণ। নীতি ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে যৌক্তিক সেবা প্রদানের লক্ষে কর্মপরিবেশের উন্নয়নে সেবাসমূহ সহজীকরণ, সেবা গ্রহণে আকৃষ্টকরণ, এসবের সহজ সরল ঘাটতি পূরণে একটি কার্যকর ফলপ্রসূ উপায়।
জাপানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি কাইজেন, যা অনুসরণে সহজে আসবে জীবনে সফলতা! সাধ আর সাধ্যের বিস্তর ফারাক প্রায় মানুষের মাঝে দেখা যায়। ইচ্ছা, আহলাদ পূরণে কে না চায়। তবে কয়জন তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে যেতে পারে? তারপরও মানুষের চেষ্টার কোন কমতি থাকে না।
জীবনের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন অনেকেই। কেউ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শরীরচর্চার সময় বের করে উঠতে পারেন না, কেউ বা এতো আলসেমিতে ভোগেন যে কাজের পর কাজ জমে যেতে থাকে কিন্তু করে হয়ে ওঠে না দিনের পর দিন। জীবনযাপনে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বুঝেও নিজেকে পরিবর্তনের প্রেরণা খুঁজে পান না অনেকেই। কেউ কেউ আবার ভোগেন মানসিক অবসাদে। কিন্তু জানেন কি একটি জাপানি পদ্ধতি বদলে দিতে পারে সবই !
কাইজেন সহজ পন্থা যেটি যে কেউ যে কোন স্থানে যে কোন সময়ে করতে পারেন অনায়াসে। এ ক্ষেত্রে অনেক সম্পদ টাকা অর্থ সুযোগ এসবের দরকার হয় না। শুধু দরকার সৃষ্টিশীল ইতিবাচক উদ্যোগী সুদৃঢ় সহনশীল লক্ষমাত্রা নির্দিষ্ট করে এগিয়ে যাবার মানসিকতা।
এটি বিশ্বস্ততার সাথে নিজের কার্যক্ষমতাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়, অনায়াসে কাজের স্বীকৃতি পাওয়া যায়, যা সামাজিক এবং মানসিক উন্নয়নের মাধ্যমে প্রচলিত ধারণা চিত্র আশ্চার্যজনকভাবে পাল্টে দেয়। এটি সঠিক সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে আশাতীতভাবে।
জীবনে যে কোনো বড় লক্ষ্য একবারে পেতে চাইলে সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতার সম্ভবনাই বেশি। বিশেষত যারা একটানা মনসংযোগ বজায় রাখতে পারেন না তাদের পক্ষে তো সমস্যা আরও বেশি। তাদের জন্য সমাধান হতে পারে কাইজেন পদ্ধতি।
জাপানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি হল কাইজেন। জীবনে ছোট ছোট অথচ নিয়মিত পরিবর্তন এনে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে একটি বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানোই এই পদ্ধতির মূল কথা। কাই শব্দের অর্থ হলো পরিবর্তন আর জেন এর অর্থ প্রজ্ঞা। তবে পদ্ধতিটির কোনো বদ্ধমূল নিয়ম কানুন না থাকলেও অনেকেই কাইজেনকে এক ধরনের জীবন চর্চা বলেও মনে করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এক-দু’মিনিটের মতো অল্পসময় নিয়েও এক একটি বিশেষ কাজ নিয়মিত করে চলা যায় তবে তা শেষ পর্যন্ত একটি বড়সড় বদল নিয়ে আসতে পারে জীবনে।
কিন্তু কীভাবে করবেন এর অনুশীলন ?
ধরুন আপনি কোনো একটি বই পড়তে চাইছেন দীর্ঘদিন কিন্তু পড়া হয়ে উঠছে না কিছুতেই। দিনের একটি সময় নির্দিষ্ট করুন বই পড়ার জন্য। বেশিক্ষণ নয়, বরং দু’-পাঁচ মিনিট সময় হলেই হবে। এবার রোজ নিয়ম করে ওই একই সময়ে দুই মিনিট ধরে পড়তে থাকুন বইটি। যতই অসুবিধা থাকুক, কোনোমতেই বন্ধ করা যাবে না এই অনুশীলন। করতে করতে অনিচ্ছা কমে আসবে অচিরেই। তারপর চাইলে বাড়িয়ে নিতে পারেন সময়। যেকোনো একটি কাজ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে নিন কাজের সংখ্যা। দেখবেন ক্রমেই একাধিক কাজের জন্য বেরিয়ে আসবে সময়।
আপাতভাবে তুচ্ছ মনে হলেও গোটা বিষয়টির ভেতরে রয়েছে বিজ্ঞান চেতনা। আসলে যেকোনো বড় লক্ষ্য দেখলে সংশয় তৈরি করাই মস্তিষ্কের জন্য স্বাভাবিক। তাই বড় কোনো লক্ষ্যমাত্রা না রেখে তাকে ছোট ছোট লক্ষ্যে ভেঙে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে। পাশাপাশি যেকোনো কাজেই প্রশিক্ষণ পেলে তা সম্পাদন করা সহজ হয় মস্তিষ্কের পক্ষে। এ পদ্ধতিতে কার্যত মস্তিস্ককে নিয়মিত কাজ করতে পারার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অদ্যাবধি বিভিন্ন ধরনের কাইজেন ইভেন্ট এর ব্যবহার আমরা দেখেছি। এর মধ্যে আপনি নিজের জন্য, কোন প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান যে কোন একটি শুরু,চর্চা ও গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাইজেন ইভেন্টগুলো হল পয়েন্ট কাইজেন, সিস্টেম কাইজেন, লাইন কাইজেন, প্লেন কাইজেন, কিউব কাইজেন। সবগুলোর কমন গোল কিন্তু একটাই, প্রত্যেকটাই আপনার কর্মশক্তির, কর্ম পদ্ধতির উদ্ভাবনের উন্নয়ন ঘটাতে সচেষ্ট থাকবে এবং কাজের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে।
(বিস্তারিত পরবর্তী পোস্টে)
লিখা:হাবিবুর রহমান
https://www.linkedin.com/in/habibur-rahman-15b21b125/
"আমাদের যে জ্ঞান সম্ভার কতটা নগণ্য মানের ছিল, তা ইন্টারনেট আমাদের হাতের নাগালে পুরোপুরি না আসা পর্যন্ত আমরা বোধ হয় জানতেই পারতাম না। অবশ্যই আমাদের পূর্ব পুরুষদের জ্ঞানার্জনের এতগুলো সহজ পদ্ধতির ব্যবস্থাই তাদের ছিলনা। প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন ফ্যাসিলিটি এবং গ্যাজেট গুলো আরো বেশি সহজলভ্য হওয়ার পর আমরা আরো বেশি করে বুঝতে পারলাম যে, আমাদের জ্ঞান সম্ভার কতটা নগণ্য মানের ছিল। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ার সাফল্য আমাদের মোবাইল ফোনের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁকিয়ে থাকার কিংবা সময় ব্যয় করা শিখতে বাধ্য করল। গুগল, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউব কিংবা ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের কিন্তু একটা বিশাল উপকার হয়েছে অটোমেটিক ভাবেই, তা হল সারা বিশ্বের সকল ধরণের নামকরা কর্মপদ্ধতি, প্র্যাকটিস, কালচার, গবেষণা, জ্ঞানের ভান্ডার, রিসার্চ পেপার ইত্যাদি সকল কিছু হাতের নাগালে এসে পড়েছে। কে, কোথায় কি নিয়ে গবেষণা করছেন, নতুন কিছু উদ্ভাবন করছেন কিংবা নতুন কিছু ভাবছেন, তা তিনি যে কোন ভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোর জন্য ডলার খরচ করে বুস্টিং পর্যন্ত করছেন। মূলত তিনি টাকা খরচ করে আমাদের কিন্তু এক প্রকার ফ্রী উপকার করেই যাচ্ছেন।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি গুলো তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধির স্বার্থেই, তাদের একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে আপনার ইন্টারেস্ট কে প্রাধান্য দিয়ে আপনার কাঙ্খিত সকল সার্চ কে ইন্টারনেট, ফেসবুকে, গুগল, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রামে অনবরত প্রদর্শন করছে। আমি এই ধরণের প্রতিটা ব্যাপারকে পজিটিভ হিসেবে মেনে নেয়ার চেষ্টা করি। আমার কাছে এগুলোকে সোশ্যাল মিডিয়ার আশীর্বাদ বলেই মনে হয়। তাই লক্ষ্য করুন যে, এখন আপনি চাইলেই যে কোন বই পড়তে পারবেন, যে কোন বিষয় নিয়ে লক্ষ আর্টিকেল অনুসন্ধান করে আপনার মন মত পড়াশুনা করে ফেলতে পারবেন, হাজার মানুষের মতামত গ্রহণ করতে পারবেন পুরোপুরি ফ্রীতেই।
ধরুন এখন আমার জন্য লীন সিক্স সিগমার ১০০ টুল নিয়ে পড়াশুনা করা, ইউটিউব ভিডিও দেখা, শত প্রকার আর্টিকেল সংগ্রহ করা শুধু মাত্র ইচ্ছা শক্তির উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিষয়টাই ২০০০ সালে অসম্ভবের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। আমি এখন ইচ্ছা করলেই জাপানীজ কর্মপদ্ধতির যে কোন পাঠ অনায়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াশুনা করতে পারছি। সবচেয়ে মজাদার বিষয় হল, পুরো ব্যাপারটাই ঘটানো সম্ভব হচ্ছে একদম ফ্রীতে।
এই রকম ভাবে আমরা সকলেই অনুসন্ধান করি না করি, কিংবা পড়াশুনা ও নাই বা করলাম, কিন্তু আমরা নিশ্চয় টার্ম গুলো কিংবা নাম গুলো কিন্তু ইতোমধ্যেই জেনে ফেলেছি। এমন একটা বহুল উচ্চারিত শব্দ হল "কাইজেন।" তবে আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, আমরা কতিপয় মানুষ শুধু শব্দটাই জানি অথবা সংজ্ঞা টুকুই ইন্টারনেটে পড়েছি, অথবা আমাদের কর্মস্থলে অনেকবার শুনেছি। তাই এই বিষয় নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনার একটা সুযোগ গ্রহণ করতে চাইছি। "কাইজেন" এর মত দারুন এবং ব্যাপক বিষয় নিয়ে যে একটা সেমিস্টার সমতুল্য পড়াশুনা করা যেতে পারে, এইটা কিন্তু আমিই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করেই শিখেছি। এতবড় এই বিষয়ে আমরা অনেকেই কেন যেন খুব কম জানি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থাতে ও এই ধরণের বিষয় গুলো বা বিশ্বের দরবারে পরীক্ষিত পদ্ধতি গুলো পাঠ্যক্রমে আনয়নের কোন সুযোগ পর্যন্ত আছে কি না আমার জানা নাই। আমার কাছে মনে হয় এই বিষয় গুলো যদি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পরীক্ষার মার্ক্স্ তোলার জন্য ও বাধ্য হয়ে পড়তাম তাহলে ও অনেক বেশি কর্মমুখী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতাম। কর্মজীবনে প্রবেশ করেই অনেক কিছু হয়ত কাজ লাগানোও যেত।
আজকের আমাদের আলোচনা "কাইজেন" নিয়ে।
বড়রা বলেন, এখন বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই নাকি মাত্রাতিরিক্ত অলস। এবং তারা নিজেদের কাজটুকু বাদ দিয়ে কোনকিছুই করতে চান না। এক জায়গায় বসে বসে কাজ হোক কিংবা মোবাইল ঘাটা, নড়াচড়ায় বেজায় নারাজ। তবে জাপানের এই পদ্ধতি আপনাকে নতুন করে মেলে ধরার সুযোগ করে দেবে! কেমন করে?
যেকোনও কাজের আগে প্রত্যেকের উচ্ছাস – মতামত এবং অনুপ্রেরণা প্রয়োজন, তবেই সেই কাজ খুব ভালভাবে সম্পন্ন হয়। আর মন মানসিক ঠিক না থাকলে আপনারই মুশকিল। সুতরাং যেটি করতে হবে সেই পদ্ধতির নাম হল কাইজেন ( Kaizen ) – এটি এমন একটি বিষয় যার মাধ্যমেই আপনি শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সচল অনুভব করবেন।
কাইজেন আসলে ঠিক কী?
এটিকে চিকিৎসার ভাষায় ওয়ান মিনিট প্রিন্সিপল বলা হয়। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে, অথবা নিজেকে মোটিভেট করতে এটি আপনার কাজে আসতে পারে। এতে অলসতা কমে গিয়েই, কাজ করার ইচ্ছে বাড়তে থাকে। জাপানিজ ভাষায়, কাই শব্দের অর্থ চেঞ্জ অথবা পরিবর্তন এবং জেন অর্থাৎ উইজডম বা ইচ্ছে। মাসাকি ইমাই নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম এই থেরাপির আবিষ্কার করেন। ইমাই মনে করেন, এমন একদিনও পার হয় না যেখানে আপনি নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ না করে চলে আসেন সেই ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে হবে। কাইজেন একদিন দুদিন নয়, প্রতিদিন অভ্যাস করতে হবে তবেই লাভ।
এটি কীভাবে কাজ করে?
কাইজেন এমন একটি থেরাপি যেটি সারাদিনে আপনার থেকে এক মিনিট চেয়ে নেয়। অর্থাৎ আপনি হঠাৎ করেই যদি কোনও বই পড়ছেন অথবা পডকাস্ট শুনছেন, সেই এক মিনিট আপনাকে নির্দিষ্ট কাজেই ব্যয় করতে হবে। হেডফোনে অডিও বুক শুনছেন কিন্তু হাতে আবার ফেসবুক স্ক্রল করছেন তাহলে কিন্তু কোনটাই হলনা। সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে – এবং প্রতিদিন একই সময় এই কাজটি করা বাধ্যতামূলক। যতই অলসতা অনুভূত হতে থাকুক, কাজ শেষ না করে ওঠা চলবে না।
কিছু কিছু বিষয় অবশ্যই এই সময় মনে রাখা দরকার:
প্রথমেই তাড়াহুড়ো করা যাবে না
প্রতিদিন সমান সময় ব্যয় করতেই হবে।
যখন একটু অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, তখন সময় চাইলে বাড়াতেও পারেন।
সারা জীবনের যেকোনও সময়ে এটিকে অভ্যাস করা যায়, নির্দিষ্ট কোনও বয়স নেই – শুধু মনে রাখবেন নিজের উদ্দেশ্যে টিকে থাকতে হবে।
কাইজেন একটি জাপানি শব্দ যার অর্থ অদম্য অব্যাহত নিরবচ্ছিন্ন পথচলা, অব্যাহত উন্নয়ন সুনিশ্চিতকরণ। নীতি ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে যৌক্তিক সেবা প্রদানের লক্ষে কর্মপরিবেশের উন্নয়নে সেবাসমূহ সহজীকরণ, সেবা গ্রহণে আকৃষ্টকরণ, এসবের সহজ সরল ঘাটতি পূরণে একটি কার্যকর ফলপ্রসূ উপায়।
জাপানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি কাইজেন, যা অনুসরণে সহজে আসবে জীবনে সফলতা! সাধ আর সাধ্যের বিস্তর ফারাক প্রায় মানুষের মাঝে দেখা যায়। ইচ্ছা, আহলাদ পূরণে কে না চায়। তবে কয়জন তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে যেতে পারে? তারপরও মানুষের চেষ্টার কোন কমতি থাকে না।
জীবনের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন অনেকেই। কেউ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শরীরচর্চার সময় বের করে উঠতে পারেন না, কেউ বা এতো আলসেমিতে ভোগেন যে কাজের পর কাজ জমে যেতে থাকে কিন্তু করে হয়ে ওঠে না দিনের পর দিন। জীবনযাপনে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বুঝেও নিজেকে পরিবর্তনের প্রেরণা খুঁজে পান না অনেকেই। কেউ কেউ আবার ভোগেন মানসিক অবসাদে। কিন্তু জানেন কি একটি জাপানি পদ্ধতি বদলে দিতে পারে সবই !
কাইজেন সহজ পন্থা যেটি যে কেউ যে কোন স্থানে যে কোন সময়ে করতে পারেন অনায়াসে। এ ক্ষেত্রে অনেক সম্পদ টাকা অর্থ সুযোগ এসবের দরকার হয় না। শুধু দরকার সৃষ্টিশীল ইতিবাচক উদ্যোগী সুদৃঢ় সহনশীল লক্ষমাত্রা নির্দিষ্ট করে এগিয়ে যাবার মানসিকতা।
এটি বিশ্বস্ততার সাথে নিজের কার্যক্ষমতাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়, অনায়াসে কাজের স্বীকৃতি পাওয়া যায়, যা সামাজিক এবং মানসিক উন্নয়নের মাধ্যমে প্রচলিত ধারণা চিত্র আশ্চার্যজনকভাবে পাল্টে দেয়। এটি সঠিক সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে আশাতীতভাবে।
জীবনে যে কোনো বড় লক্ষ্য একবারে পেতে চাইলে সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতার সম্ভবনাই বেশি। বিশেষত যারা একটানা মনসংযোগ বজায় রাখতে পারেন না তাদের পক্ষে তো সমস্যা আরও বেশি। তাদের জন্য সমাধান হতে পারে কাইজেন পদ্ধতি।
জাপানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি হল কাইজেন। জীবনে ছোট ছোট অথচ নিয়মিত পরিবর্তন এনে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে একটি বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানোই এই পদ্ধতির মূল কথা। কাই শব্দের অর্থ হলো পরিবর্তন আর জেন এর অর্থ প্রজ্ঞা। তবে পদ্ধতিটির কোনো বদ্ধমূল নিয়ম কানুন না থাকলেও অনেকেই কাইজেনকে এক ধরনের জীবন চর্চা বলেও মনে করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এক-দু’মিনিটের মতো অল্পসময় নিয়েও এক একটি বিশেষ কাজ নিয়মিত করে চলা যায় তবে তা শেষ পর্যন্ত একটি বড়সড় বদল নিয়ে আসতে পারে জীবনে।
কিন্তু কীভাবে করবেন এর অনুশীলন ?
ধরুন আপনি কোনো একটি বই পড়তে চাইছেন দীর্ঘদিন কিন্তু পড়া হয়ে উঠছে না কিছুতেই। দিনের একটি সময় নির্দিষ্ট করুন বই পড়ার জন্য। বেশিক্ষণ নয়, বরং দু’-পাঁচ মিনিট সময় হলেই হবে। এবার রোজ নিয়ম করে ওই একই সময়ে দুই মিনিট ধরে পড়তে থাকুন বইটি। যতই অসুবিধা থাকুক, কোনোমতেই বন্ধ করা যাবে না এই অনুশীলন। করতে করতে অনিচ্ছা কমে আসবে অচিরেই। তারপর চাইলে বাড়িয়ে নিতে পারেন সময়। যেকোনো একটি কাজ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে নিন কাজের সংখ্যা। দেখবেন ক্রমেই একাধিক কাজের জন্য বেরিয়ে আসবে সময়।
আপাতভাবে তুচ্ছ মনে হলেও গোটা বিষয়টির ভেতরে রয়েছে বিজ্ঞান চেতনা। আসলে যেকোনো বড় লক্ষ্য দেখলে সংশয় তৈরি করাই মস্তিষ্কের জন্য স্বাভাবিক। তাই বড় কোনো লক্ষ্যমাত্রা না রেখে তাকে ছোট ছোট লক্ষ্যে ভেঙে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে। পাশাপাশি যেকোনো কাজেই প্রশিক্ষণ পেলে তা সম্পাদন করা সহজ হয় মস্তিষ্কের পক্ষে। এ পদ্ধতিতে কার্যত মস্তিস্ককে নিয়মিত কাজ করতে পারার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অদ্যাবধি বিভিন্ন ধরনের কাইজেন ইভেন্ট এর ব্যবহার আমরা দেখেছি। এর মধ্যে আপনি নিজের জন্য, কোন প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান যে কোন একটি শুরু,চর্চা ও গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাইজেন ইভেন্টগুলো হল পয়েন্ট কাইজেন, সিস্টেম কাইজেন, লাইন কাইজেন, প্লেন কাইজেন, কিউব কাইজেন। সবগুলোর কমন গোল কিন্তু একটাই, প্রত্যেকটাই আপনার কর্মশক্তির, কর্ম পদ্ধতির উদ্ভাবনের উন্নয়ন ঘটাতে সচেষ্ট থাকবে এবং কাজের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে।
(বিস্তারিত পরবর্তী পোস্টে)
