কাইজেন(KAIZEN) কি ? (পর্ব-২)

 


প্রতিবন্ধকতায় হোঁচট খাওয়াঃ 

কাইজেন নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা সহজসাধ্য নাও হতে পারে। শুরুতে সকলেই খুবই অনুপ্রাণিত হয়ে পুরোপুরি একটা নতুন অভ্যাস বেছে নেয় কিংবা কঠিনতর কোন বদভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অথবা অন্যান্য কাজের চাপে নতুন প্রচেষ্টা গুলো বজায় রাখা দুস্কর হয়ে পড়ে। আর চাকুরীচ্যুত হওয়া, প্রিয়জনকে হারানো, পারিবারিক কোন বন্ধন ভেঙে যাওয়া, অসুস্থ্য হয়ে পড়া এমন কোন একটা ঘাত প্রতিঘাতে আমরা যদি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন তো এই অধ্যাবসায় বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন অতিশয় বেদনাদায়ক অথবা অসহনীয় কোন কিছু ঘটে তখন, আমরা আবার আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা বা কমফোর্ট জোনে প্রবেশ করতে দ্বিধা করিনা। পুরাতন অভ্যাস গুলো দ্রুত মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এমনকি নতুন সন্তান ঘরে এল, ভাল একটা চাকুরী পেলাম, লটারী পেয়ে গেলাম, বড় কোন প্রাপ্তি নিশ্চিত হল এমন ভাল কিছু যদি আমাদের জীবনে ঘটে যায়, তাহলেও আমাদের পুরাতন অভ্যাস সাথে সাথেই ফেরত আসে। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে আমি তো আদতেই শুধু চেষ্টা করেই যাচ্ছিলাম, যার সকল কিছুই তো আমার মানসিকতার বিরুদ্ধে ,এবং এই টা কিন্তু আমার নিজের বিরুদ্ধেই নিজের যুদ্ধ । 

কাইজেন হল পুরো জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তনের অঙ্গীকার। আমাদের জীবনে উত্থান পতন হল নিত্যদিনের সঙ্গী এবং এরই নাম জীবন। এটা মেনে নিয়েই কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত চলছি। এই নশ্বর পৃথিবীতে কেউই কিন্তু নিখুঁত নয়, এবং কাইজেনের মূল বক্তব্য ও কিন্তু আপনাকে পুরো দস্তুর নিখুঁত বানানোর কোন কিছু না। এটা আমাদের এই চাঞ্চল্যকর এবং অনিশ্চয়তায় পূর্ণ জীবন সংগ্রামের মাঝেই কিভাবে আরো একটু ভাল কিছু করা যায় এই নিয়ে প্রতিদিনের একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র। এটা টয়োটা প্রোডাকশনের মত, আগের কাজ গুলো আগের মতই চলবে, কিন্তু এর মাঝে কি করে আর একটু দুর্দান্ত কিছু করা যায়, কিভাবে আর এক দফা চমক প্রদান করা যায়। এই দুঃসাহসিক যাত্রায় প্রতি পদে পদেই প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ন থাকবে। এবং এরই মাঝে কিছু ধারা ও বিন্যাস নিশ্চিত করে এগুলোর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় তো কাইজেন।

বিপত্তির আগেই পরিকল্পনা গ্রহণ:

একটি নতুন কিছু শুরু করার আগে বা একটি খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার পরিকল্পনা করার আগে, এমন কিছু জিনিস সম্পর্কে চিন্তা করে রাখতে হবে, যা আপনাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিপত্তি গুলো থেকে আগেই সচেতন করে রাখবে। আপনি যদি আপনার অ্যালকোহল সেবনের মাত্রা কমানোর চেষ্টা করেন, তাহলে সামনের কোন ছুটির কিংবা উৎসবের দিন আছে যেখানে আপনার বন্ধু বান্ধবের চাপে পড়ে আপনার একটু বেয়াড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে, চিন্তা করুন। সিগারেট ছাড়ার সময় আমাদের সবচেয়ে ভয়াবহ রিস্কে থাকতে হয় বন্ধুবান্ধবের আড্ডাতে। কেউ চাপ না দিলে ও মন টা আঁকুপাঁকু করতে থাকে একটা টান দেয়ার জন্য। অথবা আপনি সকালে উঠে জগিং করতে চাইছেন কিন্তু যদি তখন বৃষ্টির মওসুম হয় তাহলে হালকা একটু বৃষ্টিতে কিন্তু আপনার মোটিভেশন নষ্ট হবেই। এই বিপত্তি গুলো চিন্তা করে মাঠে নামুন। সম্ভাব্য হোঁচট খাওয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সেই ঘটনা গুলি ঘটলে আপনি কিভাবে তা ম্যানেজ করে সামনে অগ্রসর হবেন তার কিন্তু বিকল্প একটা রাস্তা দেখিয়ে দেবে।সময়কাল বুঝেই যে কোন কার্যক্রম এর চিন্তা করা বাঞ্ছনীয়।


বছরের সময় অনুসারে যে কোন একটিভিটি করার চিন্তা করাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। প্রচন্ড শীতে কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় নিশ্চয়ই আপনি পুকুরে কিংবা নদীতে সাঁতার কাঁটার কোন ঝামেলা তে যাবেন না। কিন্তু শীতের পরে কিংবা গ্রীষ্মের শুরুতে কিন্তু আপনি এই কাজটাই খুব স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে করবেন। তাই আমাদেরই সচেতনতা কিন্তু আমাদের নতুন কোন অভ্যাস কে গ্রহণ, চর্চা এবং লালন পালনে সাহায্য করবে। রমজান মাসে সিগারেট ছাড়ার পরিকল্পনা করে কিন্তু অনেকেই সফলকাম হয়েছেন। এই সময়ের পুরো আবহ, কার্যক্রম, সামাজিকতা, পারিপার্শ্বিকতা, ধ্যান জ্ঞান সকল কিছুই আপনার ওই বদভ্যাস থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করার জন্য পুরো অবকাঠামোটা যেন নির্মিত হয়েই আছে , এর সাথে শুধু আপনার সদিচ্ছার যোগসাজসই যথেষ্ট। তাই একটু সচেতন ভাবে যদি আমরা এই অভ্যাস পরিবর্তনের কাজটুকু শুরু করি তাহলে অতি দ্রুত সফলকাম হতে পারব। অন্য কেউ কিভাবে পেরেছে বা কিভাবে শুরু করছে, তার সাথে কিন্তু আপনার নাও মিলতে পারে। কারণ আমরা প্ৰত্যেকেই কিন্তু প্রত্যেকের থেকে আলাদা। সাফল্য উদযাপন কিন্তু জরুরী।


আমরা সাধারণত স্বীয় সাফল্য উদযাপন করিনা। যে কোন কাজের অগ্রগতির ট্র্যাক রাখা এবং আপনি সম্পূর্ণ করতে পেরেছি, এমন মাইলফলক অর্জনের নোট করা কিন্তু আমাদের প্রেরণাকে নড়বড়ে হতে দেয়না এবং আমাদের কাজগুলোকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বরং অনুপ্রাণিত করে। সাফল্য কিন্তু সাফল্যের জন্ম দেয়, তাই একটি চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ করে ফেলাটা আপনাকে অন্য কিছু চেষ্টা করার জন্য দারুণ ভাবে উজ্জীবিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি বাড়িতে একটি সুন্দর ছিমছাম বসার জায়গা তৈরি করেন এবং এই জায়গাটিতে কিছু একান্ত সময় ব্যয় করেন স্থান টি কে উপভোগ করা শুরু করেন, তাহলে আপনি আপনার কর্মক্ষেত্রেও এমন সুন্দর একটা কাজের জায়গা তৈরি করতে আরও বেশি আগ্রহী বোধ করবেন। সেই জায়গা টাও আপনি উপভোগ করবেন। 


আসুন একটু বিস্তারিতভাবে প্রতিটি পর্যালোচনা করি।


🔹পয়েন্ট কাইজেন ::

কাইজেন ইভেন্টের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হল পয়েন্ট কাইজেন। এটি একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্কস্টেশন এর দ্রুত উন্নতির জন্য কাজ করাকে বুঝায়। এর জন্য খুব বেশি পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। এটি হল "প্রস্তুতি নাও, স্পার্ক করো, লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাও " । আমাদের দৈনন্দিন কাজে ভুল হতেই পারে কিন্তু যখনই কোন একটা ভুল ধরা পড়লো সাথে সাথেই প্রস্তুতি নিয়ে জ্বলে ওঠা এবং দ্রুত সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। 


উদাহরণস্বরূপ, আমরা প্রোডাকশন লাইনে একটি রুটিন পরিদর্শনের সময় কোন একজন সুপারভাইজার আবিষ্কার করলেন যে দুইটা মেশিনে স্কিপ স্টিচ হচ্ছে আর একটা মেশিনে বারবার সুতা ছিড়ে যাচ্ছে। তাহলে ত্রুটিপূর্ণ মেশিনের জন্য প্রোডাকশন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই যে এইটা দেখার সাথে সাথেই বিদ্যুৎ গতিতে মেইন্টেন্যান্সের টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজটা সরিয়ে নিলে প্রোডাকশন এর ক্ষতি থেকে যথাসাধ্য মুক্ত থাকতে পারলাম। হয়ত এই একটা মেশিনের জন্য অন্যান্যদের প্রোডাকশন ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ডেইলী টার্গেট মিট করতে পারছিল না পুরো লাইনের সকল মানুষ গুলো। পরবর্তী দিনের প্ল্যান পর্যন্ত ভেস্তে যাচ্ছিল। পুরো প্রসেস টা হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছিল। এই যে প্রস্তুতি, দ্রুত একশন এবং সমাধান কে আমরা পয়েন্ট কাইজেন বলতে পারি। কাইজেন এমন একটি প্রক্রিয়া যা একটি প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে সাহায্য করে।

পয়েন্ট কাইজেনের ব্যবস্থাপনা গুলো ছোট্ট এবং কার্যকর সাধারণ পদক্ষেপ যা বাস্তাবায়ন করা ও সহজ। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে যে একেকটা অন্যটার সাথে সংযোজিত না কিন্তু বাস্তবে দেখুন সামান্য একটা বিষয়ের জন্য প্রভাবটা কতদূর পর্যন্ত পড়তে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, পয়েন্ট কাইজেন ইভেন্টগুলির বুমেরাং প্রভাব থাকতে পারে। এর মানে হল যে একটি এলাকায় এর ইতিবাচক প্রভাব অন্য এলাকায় সামান্য নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।


🔹সিস্টেম কাইজেন::

সিস্টেম কাইজেন হল একটি সুসংগঠিত ধরনের কাইজেন ইভেন্ট। সিস্টেমগত  উদ্ভূত কোন সমস্যার সমাধান প্রদানে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটাকে আমরা একটি উচ্চ-স্তরের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করতে পারি যা একটু দীর্ঘ সময় নিয়ে ফলাফল প্রদান করে। এটি পয়েন্ট কাইজেনের ঠিক বিপরীত ভাবে কাজ করে। পয়েন্ট কাইজেন ইভেন্টে ছোট সমস্যা সনাক্তকরণের ফলে প্রত্যেকটা ব্যাপারকে অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান করা হয় কিন্তু সিস্টেম কাইজেন ইভেন্টে তা করা সম্ভবপর হয়ে উঠবেনা। 


🔹লাইন কাইজেন::

এটি এক ধরনের কাইজেন ইভেন্ট যেখানে উন্নতির কাঠামো একটি মডেল লাইন প্রক্রিয়ার মতো দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, একই সাথে আমরা যদি প্রকিউরমেন্ট( ক্রয়) এবং পরিকল্পনা বিভাগে একই সাথে একটি কাইজেন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করি। যেহেতু প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট প্রকিউরমেন্ট ঠিক আগের কাজটাই করে থাকে, তাই আমরা নিরাপদে এটিকে লাইন কাইজেন বলতে পারি।

🔹প্লেইন কাইজেন::

প্লেন কাইজেন হল লাইন কাইজেনের উপরের স্তর, এতে বেশ কয়েকটি লাইন একসাথে সংযুক্ত হয়ে কাজ করবে । আধুনিক পরিভাষায়, এটিকে একটি ভ্যালু স্ট্রীম হিসাবেও বর্ণনা করা যেতে পারে, যেখানে পুরাতন দিনের বিভাগ পদ্ধতির পরিবর্তে, আপনার প্রতিষ্ঠান নতুন কাঠামো তে প্রোডাক্ট লাইন, ক্যাটাগরি এবং ভ্যালু স্ট্রিম দিয়ে পুনর্গঠিত করা হবে। একটি লাইনের কার্যকরী উন্নয়ন সাধন হলে  যে পরিবর্তন টা পরিলক্ষিত হবে, সেই উন্নতি গুলিকে অন্যান্য লাইন বা প্রক্রিয়া গুলোতে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

🔹কিউব কাইজেন::

কিউব কাইজেন হল এক ধরনের কাইজেন ইভেন্ট, যেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত উন্নয়ন প্রক্রিয়া জড়িত থাকে। প্রত্যেকটা পয়েন্ট একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকবে, কোন প্রকার ডিসকানেকশন থাকবেনা। 

এমন কোন প্রতিষ্ঠান যদি থাকে যেখানে লীন এর মেথড গুলো সকল ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, লিন কালচার প্রতিষ্ঠিত এমন একটি পরিস্থিতির সাথে কিউব কাইজেন সাদৃশ্যপূর্ণ হবে। কর্ম পদ্ধতি ও উন্নয়নগুলো সর্বত্র বিরাজমান হবে এমনকি প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী, কাস্টমার সকলেই এর সুফল ভোগ করবে। এমনকি, এর জন্য স্বাভাবিক ব্যবসায়িক নীতি, প্রক্রিয়া গুলোকে ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে, সেইসাথে উন্নতিগুলি সমগ্র প্রতিষ্ঠান জুড়ে যাতে প্রভাব বিস্তার করে তা নিশ্চিত করতে হবে। 


                                                                                                         (বিস্তারিত পরবর্তী পোস্টে)


Post a Comment

Previous Next

نموذج الاتصال